
কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি টিমের বিরুদ্ধে ৪০ কেজি গাঁজা উদ্ধার সংক্রান্ত গুরুতর অনিয়ম ও তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত টিম লিডার হিসেবে কুমিল্লা ডিবি পুলিশের কর্মকর্তা তৌকিক (তৌফিক নামেও পরিচিত)–এর নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কাগজে-কলমে ট্রেনিংয়ে থাকার অজুহাত দেখিয়ে তিনি ও তার টিম উদ্ধারকৃত বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করে গোপন রাখার চেষ্টা করেন।
গণমাধ্যমের অনুসন্ধান টিমের তদন্তে উঠে এসেছে, ১০ জানুয়ারি রাত আনুমানিক ২টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট এলাকায় একটি অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে কোনো মাদক ব্যবসায়ী আটক না হলেও ৪০ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে বিস্ময়করভাবে, উদ্ধারকৃত এই মাদকদ্রব্যের কোনো তথ্য সংশ্লিষ্ট থানার জব্দ তালিকা কিংবা অফিসিয়াল রেকর্ডে পাওয়া যায়নি।
ট্রেনিংয়ে থেকেও রাতের অভিযান!
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, অভিযুক্ত ডিবি কর্মকর্তা তৌকিক ওই দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ট্রেনিংয়ে ছিলেন বলে অফিসিয়ালভাবে দেখানো হয়। ট্রেনিংটি কুমিল্লা জেলার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। অথচ একই দিনে গভীর রাতে নাঙ্গলকোটে অভিযানের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে পড়ায় প্রশ্ন উঠেছে—
ট্রেনিংরত একজন কর্মকর্তা কীভাবে রাত ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত অভিযানে নেতৃত্ব দিলেন?
প্রশ্নের মুখে তৌকিকের বক্তব্য
এ বিষয়ে প্রতিবেদক তৌকিকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দাবি করেন,
“আমি ট্রেনিংয়ে ছিলাম। ঘটনাস্থলে আমি ছিলাম না।”
তখন প্রতিবেদক জানতে চান,
“আপনি ট্রেনিংয়ে থাকলে ওই
অভিযানে আপনার টিমের নেতৃত্বে কে ছিলেন?”
এ প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট কোনো নাম বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কথা না বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এক পর্যায়ে তিনি দাবি করেন,
“আমি নাঙ্গলকোটে যাইনি, আমার টিম যায়নি, এমনকি আমার টিমের গাড়িও যায়নি।”
তিনি সাংবাদিকদের কাছে প্রমাণ চাইলে অনুসন্ধান টিম জানায়,
“প্রমাণ আপনাকে দেখাতে হবে না। প্রমাণ প্রয়োজনে কুমিল্লার পুলিশ সুপারের কাছে উপস্থাপন করা হবে। আপনার লোকেশন ট্র্যাকিং করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।”
সাংবাদিকের বক্তব্য
সাংবাদিক অনুসন্ধান টিমের বক্তব্য অনুযায়ী,
“পুলিশের কেউ অনিয়ম বা অপরাধে জড়িত থাকলে প্রাথমিকভাবে অস্বীকার করাই তাদের সাধারণ কৌশল। এটি নতুন কিছু নয়। কিন্তু পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি গঠিত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে।”
তারা আরও বলেন,
“অপরাধের পর অস্বীকারই অনেক সময় তদন্তের মূল সূত্র হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক যেমন সিআইডি বা সিবিআই তদন্তে দেখা যায়।”
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীর অভিমত
এ বিষয়ে একজন আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“যদি কোনো উদ্ধারকৃত মাদক জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হয়, তাহলে সেটি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের শামিল। এটি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মাদক পাচারে সহায়তার ইঙ্গিত বহন করে।”
একজন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধি বলেন,
“আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি নিজেরাই মাদক সংক্রান্ত অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে সমাজের জন্য সেটি আরও ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সুষ্ঠু তদন্ত ও
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এখন সময়ের দাবি।”
ওসি ডিবি আলমের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে কুমিল্লা ডিবির অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান,
“বিষয়টি সম্পর্কে আমি এখনো অবগত নই।”
প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,
“যদি সঠিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
দাবি উঠেছে স্বাধীন তদন্তের
এ ঘটনায় সুশীল সমাজ ও সাংবাদিক মহল থেকে দাবি উঠেছে—
অভিযুক্ত কর্মকর্তার লোকেশন ট্র্যাকিং
সংশ্লিষ্ট ডিবি টিমের গাড়ির মুভমেন্ট রেকর্ড
উদ্ধারকৃত ৪০ কেজি গাঁজার বর্তমান অবস্থান
এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন
না হলে, এমন অভিযোগ পুলিশের প্রতি জনআস্থাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবেদনটি তদন্তাধীন। পরবর্তী তথ্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।


















